শিরোনামঃ

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আলোকবর্তিকা

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আলোকবর্তিকা

নিউজ ডেক্সঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। এ দেশের সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি-নীতি এবং সার্বিক জীবনপ্রবাহ কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশ এখনো গ্রামীণ বাংলাদেশ-পল্লী বাংলাদেশ। কেননা এ দেশের ৬০-৭০ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। কৃষিতে ৪১ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। কৃষি বাংলাদেশের ১৬ দশমিক ৫ কোটি মানুষের শুধু খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করে না, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের জোগানও দেয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি অদূরভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও উর্বর জমি সারা বছর ধরে বিভিন্ন ফসল উত্পাদনের জন্য খুবই উপযোগী। ফসলের পাশাপাশি এ দেশের কৃষক আদিকাল থেকে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন করে এবং বাড়ির আঙিনায় পুকুর, ডোবা-নালা থাকলে সেখানে মাছ চাষ করে। প্রাকৃতিক জলাশয়-নদী, খাল-বিল, সমুদ্রে প্রচুর মাছ পাওয়া  যায়। তাই বলা যায়, কৃষি অর্থনীতির চারটি মূল উপখাত ১. ফসল, ২. প্রাণিসম্পদ, ৩. মত্স্য ও ৪. বন বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান। বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য, তাঁত শিল্প, কুটির শিল্পের কারণে বাংলা ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল, যা সহজেই বিদেশী শাসকগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করত। শাসন ও শোষণের জন্য দীর্ঘদিন দিল্লির মোগল ও ইংরেজ শাসকদের সর্বোচ্চ অর্থসম্পদের উত্স ছিল বাংলা। সর্বশেষ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শাসকদের ন্যায় একটানা ২৩ বছর সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বর্তমান পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে। এভাবে বাংলার কৃষক ছিলেন চিরদিন শোষণ-শাসনের শিকার এবং চিরবঞ্চিত ও অবহেলিত।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৈশোর-তরুণ বয়স থেকে বাংলার কৃষকের এই দৈন্য স্বচক্ষে দেখেছেন, যা তাঁর হূদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তাই আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনজুড়ে কৃষক ও কৃষির উন্নয়ন এবং কল্যাণ ভাবনা নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। পঞ্চাশের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কৃষক ও কৃষি উন্নয়নের কথা বলতেন অত্যন্ত জোরালোভাবে। পাকিস্তানের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় কৃষি উন্নয়ন, পাটের মূল্য, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয় সবিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার গঠনের পর পরই বঙ্গবন্ধু উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকেই নিলেন কৃষকদের জন্য এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তাদের সব বকেয়া খাজনার সুদ মওকুফ করে দিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনাও মওকুফ করার ঘোষণা দিলেন। তিনি কৃষি বিপ্লব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ভূমি সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিলেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি ও খাসজমি ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নিলেন। পাকিস্তানি শাসনামলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেন এবং তাদের সব বকেয়া ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেয়া হয়। দেশের জন্য দ্রুত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে গঠন করেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশন।

বঙ্গবন্ধু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষিকে অগ্রাধিকারভুক্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ কৌশল প্রবর্তনের মাধ্যমে টেকসই কৃষির যাত্রার সূচনা করেছিলেন।গঙ্গা নদীর প্রবাহ থেকে অধিক পানিপ্রাপ্তি, সেচ ব্যবস্থার প্রসার, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশকের ব্যবহার, নানা ধরনের প্রণোদনা এবং সার্বিক কৃষকদরদি নীতির ফলে কৃষি ক্ষেত্রে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল, তার অনুসরণে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে এবং টানা তৃতীয় মেয়াদে ২০০৯-২০১৪ প্রথম মেয়াদ, ২০১৪-২০১৮ দ্বিতীয় মেয়াদ এবং তৃতীয় মেয়াদের (বর্তমান সময় অবধি) বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে বাংলাদেশ হয়েছে খাদ্য ঘাটতির দেশ। এই খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা হয়েছে হয় খাদ্য আমদানি করে অথবা বিদেশী সাহায্য দিয়ে। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলতেন, ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান থাকে না। বাংলাদেশ অস্বাভাবিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রায় প্রতি বছর বন্যা, খরা, ঝড়, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের সম্পদ ও ফসলের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। সম্প্রতি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরাম থেকে জানা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ঝুঁকি আরো বাড়বে। বাংলাদেশ পৃথিবীর ষষ্ঠতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তাছাড়া এই দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১২০০ মানুষ)। একটি দেশের খাদ্য উত্পাদনের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সে দেশের চাষাবাদের ভূমি ও পানি। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে (প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে), অন্যদিকে শহর সৃষ্টি, শিল্প-কারখানা নির্মাণ, বাড়িঘর তৈরি ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমছে। ১৯৭১-৭২ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। কৃষি উন্নয়নে আগে বিদেশী সাহায্য পাওয়া যেত ওডিএর ১৮-২০ শতাংশ, যা কমে হয়েছে ৪ শতাংশেরও কম। দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ায় মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পূরণের জন্য খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি করতে হবে অব্যাহতভাবে।

উল্লিখিত প্রতিকূল বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন এবং তা টেকসই রাখা বাংলাদেশের জন্য খুবই কঠিন চ্যালেঞ্জ। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের ফলে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সূচিত স্বৈরশাসন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারার অবসান হয়। কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন শুরু হয়। মাত্র পাঁচ বছরে উন্নয়ন অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে অর্জিত হয় চমকপ্রদ সাফল্য। প্রথমবারের মতো দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে দেশে ৪০ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক ‘সেরেস’ পদকে ভূষিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আবার কৃষিতে স্থবিরতা নেমে আসে। ২০০১-০২ সালে দানাজাতীয় খাদ্যের উত্পাদন ২৬৮ লাখ টন থেকে নেমে আসে ২৬১ লাখ টনে। সূচিত হয় আবার নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা।

দেশরত্ন শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ ও ‘রূপকল্প ২০২১’-এর আলোকে প্রণয়ন করেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১)’ এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা; যা উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে আসছে। শেখ হাসিনা সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১৪-১৮) প্রণীত হয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। রূপকল্প ২০২১ সামনে রেখে ২০০৯ সালে উন্নয়নের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তার গতি ও পরিধি সরকারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। আনন্দের কথা হলো, বিগত বছরগুলোর ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বলয় অতিক্রম করে আজ ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এরই মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচনসহ এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ সফলভাবে অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) গুরুত্ব সবিশেষ বিবেচনায় নিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করা হয়েছে।

দারিদ্র্য বিমোচন করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। দারিদ্র্য বিমোচনের কৌশল হচ্ছে কৃষি ও পল্লীজীবনে গতিশীলতা। কৃষিই দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। এ লক্ষ্যে ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও বীজ সরবরাহ, কৃষি উপকরণে প্রণোদনা প্রদান, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রবর্তন এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, কৃষি খাতের উন্নয়নে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষিজমির আওতা সম্প্রসারণ, কৃষকদের ডাটাবেজ তৈরীকরণ, প্রশিক্ষণ, শস্য বহুমুখীকরণ, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতের সহায়ক পরিবেশ সৃজন, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি গবেষণার জন্য এনডাউমেন্ট ফান্ড মঞ্জুর এবং উত্পাদন বৃদ্ধি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার্থে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম প্রতি বছর অব্যাহতভাবে করা হচ্ছে। ফলে কৃষি খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ধান উত্পাদন ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। গম ১২ লাখ টন, ভুট্টা ৫৪ লাখ টন এবং আলু উত্পাদন হচ্ছে ১ কোটি ৯ লাখ টন। ডাল, শাকসবজি, ফলমূল, তেল ইত্যাদি ফসলের উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উত্পাদনে সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে তৃতীয়, আম উত্পাদনে সপ্তম, পাট উত্পাদনে দ্বিতীয়, চা উত্পাদনে চতুর্থ, আলু ও পেয়ারা উত্পাদনে অষ্টম এবং সবজি উত্পাদনে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।

দেশ দানাদারজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় কৃষিতে সরকারের এখন লক্ষ্য হলো, একে অধিকতর লাভজনক করা। কৃষিকে আধুনিকীকরণ, যান্ত্রিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করা। সে লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সারা দেশে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে এবং উপকূলীয় ও হাওড়াঞ্চলে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের মাঝে এসব কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৫২ হাজার কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই সারের দাম কমানো ও সার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সারের মূল্য চার দফায় কমিয়ে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিগত ১৬ ডিসেম্বর ডিএপি সারের মূল্য প্রতি কেজি ২৫ টাকা থেকে পুনরায় কমিয়ে ১৬ টাকায় নির্ধারণ আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ সিদ্ধান্তের ফলে বোরো ধান ও অন্যান্য ফসলের উত্পাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

গবাদি পশুপাখির টিকা উত্পাদন, চিকিত্সাসেবা প্রদান, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে জাত উন্নয়ন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দুধ, ডিম, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ফার্ম, মত্স্য চাষের খামার স্থাপন কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। ফলে দুধ, ডিম, মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিজাতীয় খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধিতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। মত্স্য খাতের উন্নয়নে মত্স্যজীবীদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান, অভয়াশ্রম স্থাপন, সমবায়ভিত্তিক মত্স্য ও মত্স্যজাত পণ্য উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সামুদ্রিক মত্স্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য ফিশিং গ্রাউন্ড চিহ্নিতকরণ, মত্স্য সম্পদের প্রজাতিভিত্তিক মজুদ নিরূপণ এবং সর্বোচ্চ সহনশীল মত্স্য আহরণ মাত্রা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ১০ বছরে মাছ উত্পাদন ২৭ দশমিক শূন্য ১ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বিপন্নপ্রায় মত্স্য প্রজাতির সংরক্ষণ, প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য মুক্ত জলাশয়ে অভয়াশ্রম স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম বহুলাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাছ, দুধ, ডিম, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর বাণিজ্যিক উত্পাদন বৃদ্ধি ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানির জন্য উত্পাদক পর্যায়ে রাজস্ব ও আর্থিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তিনি নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সার্বিক কৃষি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৫ হাজার কোটি টাকার ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কৃষকদের প্রদত্ত আরো ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণের সুদ ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে নির্ধারণ করেছেন।

চলমান কভিড-১৯ সারা পৃথিবীর মানুষের জীবনকে বিপর্যুদস্ত করে তুলেছে। পুরো পৃথিবীকে আজ এক নতুন, অজানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষের জীবন-জীবিকাকে যেমন হুমকির মুখে ফেলেছে, তেমনি এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী খাদ্য উত্পাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ব্যাহত করছে। কোটি কোটি মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটের দিকে। এরই মধ্যে পৃথিবীর অনেক দেশেই করোনার কারণে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ফলে করোনা, আম্পান ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যা মোকাবেলা করে বাংলাদেশ খাদ্য উত্পাদনের ধারা অব্যাহত রেখেছে। করোনার বিরূপ পরিস্থিতিতেও বিশ্বে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু কৃষি সমবায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং সমবায়ের আন্দোলনকে কৃষি বিপ্লব বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সময়ের কারণে সমবায় নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। দেশরত্ন শেখ হাসিনা সমবায় ধারণাকে গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে একীভূত করে চালু করেছেন ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও দুষ্প্রাপ্য সীমিত সম্পদের ব্যবহার বাড়িয়ে উত্পাদন ও আয় বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখছে। গ্রামীণ মানুষের সঞ্চিত মূলধন কীভাবে আরো উত্পাদনশীল কাজে বিনিয়োগ করা যায়, সে উদ্দেশ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পল্লী এলাকায় মূলধন প্রবাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটা সুদূরপ্রসারী অবদান রাখবে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের সাফল্য সারা পৃথিবীতে বহুলভাবে প্রশংসিত ও নন্দিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা, বিশ্বের গণমাধ্যম বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অভিহিত করছে। যারা একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, তারা আজ বলছে  Bangladesh has shown the pesimist world that Bangladesh no longer is a basket case.

দেশের উন্নয়ন হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নেতৃত্ব ও সাযুজ্যপূর্ণ নীতিমালার গভীর সংমিশ্রণ। একটি নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে এবং নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়ে উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের এক অভূতপূর্ব উল্লম্ফন ঘটেছে। তার প্রধান কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের। তিনি দেশকে মর্যাদা ও সম্মানে বিশ্বপরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’—এ প্রতিশ্রুতির অন্যতম লক্ষ্য ও অঙ্গীকার ‘সকলের জন্য পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান’। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সরকার প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-৪২) প্রণয়ন করেছে। কৃষি, কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য প্রণীত প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) কৌশল অনুসরণের ধারা অব্যাহত থাকবে। আমরা এসডিজি অর্জনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে উন্নীত হতে চাই। এ লক্ষ্যে কৃষির আধুনিকায়ন, যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিক কৃষির বিকাশ সাধন, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণ, সাপ্লাই চেইন/ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা, গ্রামীণ অকৃষিজ খাতের উন্নয়ন, বিশ্বায়ন মোকাবেলায় উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ এবং কৃষিজ ও অকৃষিজ পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত ও গতিময় করা হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আলোকবর্তিকা তাঁর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতে। তাঁর নেতৃত্বে আমরা গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমৃদ্ধ ও শান্তির ‘সোনার বাংলা’।

লেখক : ড. আব্দুর রাজ্জাক: মন্ত্রী, কৃষি মন্ত্রণালয়

No comments

-->