শিরোনামঃ

দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপথ থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ দর্শন

দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপথ থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ দর্শন

অনলাইন ডেক্সঃ

তবে 'মুজিববাদ' টার্মটি স্বাধীনতার পরে পরিচিতি পেলেও এর শিকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। স্বাধীনতার পর সংবিধানের এই চারটি শব্দ হাওয়া থেকে এনে জুড়ে দেননি বঙ্গবন্ধু। বরং ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজদের শোষণের মধ্যে বেড়ে ওঠা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এবং পরবর্তীতে দেশভাগের পর পর পাকিস্তানিদের বৈষম্যের প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ রাজপথ ও কারাগারের অন্ধকারে যৌবন কাটানো সময়গুলো থেকেই এই ধারণাগুলো অর্জন করেছেন তিনি। এই চার নীতির সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের পদযাত্রায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি সবসময় একটা কথা বলতেন, তা হলো- শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। এই শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যই গণতন্ত্র এ সমাজতন্ত্রের এক ব্যতিক্রমী সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এবং পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বিশ্বে প্রথমবারের মতো, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

শুধু গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতেই, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে বাংলায় ১৬৭ আসন জিতে পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট থাকার পরও, স্বাধীনতার পর নির্বাচন দেন তিনি। ১৯৭২ সালজুড়ে বিধ্বস্ত দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর প্রাথমিক সংষ্কার সাধন এবং সংবিধান প্রণয়ন করেন। এরপর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনেও দেশের আপামর জনগণ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে বিজয়ী করে। মূলত পুরো সংসদই ছিল আওয়ামী লীগের। এই সংসদে পরবর্তী পাঁচ বছর আওয়ামী যা চাইতো, একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাই করা সম্ভব ছিল।

কিন্তু গণতন্ত্রের নামে যেন-তেনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা না করে, বঙ্গবন্ধু চাইলেন- সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন। বাংলার ৮০ ভাগ গ্রামীণ মানুষের জন্য বৈষম্যহীন জীবন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। এজন্য স্বাধীনতার পরপরই পাটকল থেকে শুরু করে বিভিন্ন কলকারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসেন। কিন্তু উগ্রপন্থী কয়েকটি বাম দল, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে তরুণদের বিভ্রান্ত একটা অংশ, কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের অপতৎপরতার কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হন। এরা স্বাধীনতার পরের তিন বছরে আওয়ামী লীগের চার জন এমপিসহ কয়েক হাজার ব্যক্তিকে হত্যা করে। শুধু ১৯৭৪ সালেই সর্বহারা, মাওবাদী ও জাসদের গণবাহিনী দ্বারা ১৫০টি ছোট-বড় হাট বাজার, ব্যাংকের প্রায় ৫০টি শাখা, ৪০টি থানা ও ফাঁড়ি লুট হয়। এমনকি ঘোড়াশাল সার কারখানার কন্ট্রোলরুম উড়িয়ে দিয়ে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত করে উগ্রপন্থীরা। তারমধ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও একটা টাউট শ্রেণির উত্থানের কারণে সৃষ্টি হয় দুর্ভিক্ষ। সার্বিক পরিস্থিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। সমাজে অরাজতা শুরু হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে উত্তরণের জন্য, সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে, এবার দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালে, জাতীয় সংসদের অনুমোদনক্রমে সংবিধানসম্মতভাবে মূলধারার সব দলকে নিয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ (বাকশাল)। বাকশাল গঠন করে রাষ্ট্রব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থার সংস্কারের ঘোষণা দেন তিনি। দেশকে ৬১ জেলায় বিভক্ত করে গর্ভনর নিয়োগ দেন। প্রতিটি জেলা এবং উপজেলাভিত্তিক প্রশাসনিক এবং বিচার ব্যবস্থা চালু করার কাজ শুরু হয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের আগেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের হাতে সপরিবারের প্রাণ হারান এই সিংহ পুরুষ।

এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাই ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো সমান উন্নত হতো। কারখানা-বাণিজ্য-অফিস সবকিছুর কেন্দ্র হতো জেলা শহর, উন্নত শহরে পরিণত হতো প্রতিটি উপজেলা, যার সুবিধা পেতো প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষটি পর্যন্ত, শহর-গ্রামের এই বৈষম্য থাকতো না। স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ পেতো এবং এর সুফল ভোগ করতো প্রতিটি মানুষ। এছাড়াও সুবিচার নিশ্চিতের জন্য উপজেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা হতো আদালত। সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থির থাকতো। ধর্ম-বর্ণ ও লৈঙ্গিক বৈষম্যের কারণে নিপীড়িত মানুষেরা মুক্ত হতো শোষণ থেকে। ভূমি ব্যবস্থা সংষ্কারের মাধ্যমে তৎকালীন দেশের প্রায় অর্ধেক ভূমিহীন মানুষের মধ্যে তা বণ্টন করে সামাজিক সাম্য গঠনের উদ্যোগটি ছিল। উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধির জন্য সমবায়ভিত্তিক ও যন্ত্রনির্ভর আধুনিক কৃষিব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন ছিল। কারখানা জাতীয়করণ এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের মাধ্যমে কোটি কোটি বাঙালির দুঃখী মুখে স্থায়ীভাবে সুখের হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

No comments

-->