শিরোনামঃ

অনলাইনে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে হচ্ছে নীতিমালা

অনলাইনে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে হচ্ছে নীতিমালা

অনলাইন ডেক্সঃ 

এসকে অনলাইন শপ ফেসবুকভিত্তিক একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ। নিজেদের পেজে বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তারা চট্টগ্রামের ভোক্তার বাসায় শতভাগ খাঁটি মধু, ঘি ও সরিষার তেল সরবরাহ করছে।একইভাবে মিষ্টি ডটকম বিডি ঢাকাভিত্তিক একটি অনলাইন শপ ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী বাসায় মিষ্টি, দই, পনির ও ঘি এবং সুন্দরবনের মধু সরবরাহ করছে।শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই নয়, ফেসবুক পেজ খুলে অনলাইনে এ ধরনের খাদ্যপণ্য বিক্রি করছে কয়েক লাখ ‘এফ-ভিত্তিক’ শপ। গত কয়েক বছরে দেশে এফ-ভিত্তিক বা ই-কমার্সভিত্তিক ব্যবসার বিপুল প্রসার ঘটেছে।সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর এ ধরনের উদ্যোগ বেশ আশাব্যঞ্জক। তবে আশঙ্কার জায়গাও কম নয়। কারণ এ ধরনের ব্যবসার পুরোটাই পরিচালিত হচ্ছে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে। আর এই অবস্থা দূর করতে নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দেশে এ ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগের প্রকৃত সংখ্যা কত, কারা কিভাবে ব্যবসা করছেন, সরবরাহ করা পণ্য কতটা মানসম্মত, প্রতারিত হলে ক্রেতা কার কাছে প্রতিকার চাইবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা বা তদারকি প্রতিষ্ঠান নেই।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এফভিত্তিক অনলাইন শপে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের প্রায় শতভাগেরই বিএসটিআইয়ের মানসনদ নেই। পণ্যের প্যাকেজিংও নিম্নমানের। সাধারণত পরিত্যক্ত বা অপ্রয়োজনীয় খালি বোতল বা বয়ামে ভরে পণ্য সরবরাহ করা হয়।

অনলাইনে ব্যবসা করা বেশিরভাগ উদ্যোগের ট্রেড লাইসেন্সও নেই।সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৯৯ ভাগ অনলাইন শপের সুনির্দিষ্ট অফিস বা ঠিকানা নেই। কেবল ফেসবুক বা মোবাইল ফোনে অর্ডার নিয়ে পণ্য পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে ভোক্তার কাছে।জনপ্রিয় অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে বলেও আছে অভিযোগ। ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণার খবর নিয়মিত আসছে সংবাদমাধ্যমে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মানসনদে বাধ্যতামূলক ২২৭টি খাদ্যপণ্যের তালিকা রয়েছে। এ তালিকায় ৫ নম্বরে আছে মধু, ৭ নম্বরে সরিষার তেল এবং ৪১ নম্বরে রয়েছে ঘি।আইন অনুযায়ী, এসব পণ্যের ব্যবসা করতে হলে বাজারজাতের আগে বিএসটিআইয়ের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে মান নিশ্চিত করতে হবে। তবে ব্যক্তিনির্ভর অনলাইন শপের কোনো পণ্যের এই সনদ নেয়ার নজির নেই।

অনলাইনে খাদ্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রে ভোক্তার প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা স্বীকার করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা।তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে দেশে ই-কমার্স বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রতারণার বেশ কিছু অভিযোগও পেয়েছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর।’

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘যেকোনো পণ্যই অনলাইনে বিক্রি হতে পারে। তবে যেসব পণ্য বিএসটিআইয়ের মান সনদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, সেই পণ্য দোকান বা অনলাইন যেখানেই বিক্রি করা হোক, বিএসটিআইয়ের সার্টিফায়েড হতে হবে। তা না হলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’বিক্রেতাদের আইন মেনে ব্যবসা করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা যে প্ল্যাটফর্মেই হোক না কেন, তার ট্রেড লাইসেন্স এবং পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার, যাতে ক্রেতার মনে সব সংশয় দূর হয়।’

অনলাইন ব্যবসা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন ক্যাব সভাপতি। তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে দেশে এফ কিংবা ই-কমার্সভিত্তিক কত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তা চিহ্নিত করা দরকার। এরপর তাদের নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশ দিয়ে ট্রেড লাইসেন্স ও পণ্যের মান সনদ নিশ্চিতে চাপ দিতে হবে। এরপর কেউ না মানলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।’ঢাকা চেম্বারের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ৩ কোটি ৬০ লাখ। আর ফেসবুকভিত্তিক বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৩১২ কোটি টাকা।

বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন অব মার্কসের (সিএম) পরিচালক মো. সাজ্জাদুল বারী বলেন, ‘অনলাইনে এখন কত মানুষ ব্যবসায় জড়িত তার সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের হাতে নেই। ফলে কারা কোন পণ্য বিএসটিআইয়ের মানসনদ ছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করছে বা কাদের ব্যবসার লাইসেন্স নেই সে বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল নই।’

ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘প্রযুক্তি উন্নয়নের যুগে অনলাইন খাতের অভাবনীয় প্রসার আমাদের আশা জোগায়। তবে এটি টেকসই হওয়া দরকার।'খাতটিকে আরও সংগঠিত করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ করাও জরুরি। তাই এই ধরনের উদ্যোক্তাদের নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় আনা জরুরি।’

অনলাইনে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় থেকে প্রায় সব পণ্যের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির।

তিনি বলেন, ‘এখানে সবাই কিন্তু সফলতা পায়নি। এ খাতে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র ৭-৮ ভাগ সাফল্য পেয়েছে। তবে খাতটির দ্রুত বিস্তার দৃশ্যমান।

‘এখন গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হলে যত দ্রুত সম্ভব একটা ই-কমার্স বিপণন নীতিমালা হওয়া দরকার। এটি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’মিষ্টি ডটকমের মালিক জুনায়েদ মিয়া স্বীকার করছেন ঘি, দই, মধু ও তেলের মতো পণ্য বিক্রিতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রয়োজন।তিনি বলেন, ‘আমরা ফেসবুক পেজে এসব পণ্যের নাম রাখি শুধু তালিকা বাড়াতে; কিন্তু বিক্রি করি না। আমরা শুধু মিষ্টি জাতীয় পণ্য বিক্রি করি।’

বিষয়টি নিয়ে  কথা হয়েছে বাণিজ্যসচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এফ বা ই-কমার্সভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবসায় জড়িতদের মনিটরিংয়ের আওতায় এনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি খাতটির বিকাশে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।’ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের ট্রেড লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি বিষয়ে নীতিমালা হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য অভিযোগ সেল গঠন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

‘এ ছাড়া এ খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদানসহ প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে সুরক্ষা দেয়ার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের অধীনে একটি পরার্শক কমিটি করা হয়েছে।’

No comments

-->