শিরোনামঃ

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন ও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাঃ

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন ও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাঃ 

অনলাইন ডেক্সঃ

আন্দোলনের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উপনিবেশিক মনোভাব ও কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক যুবলীগের পর যে ছাত্র সংগঠনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেটি হলো পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এটি ছিল তখন পূর্ব বাংলায় একমাত্র সরকার বিরোধী সংগঠন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগই হল তখন প্রথম ছাত্র সংগঠন যে সংগঠনটি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর কলকাতার ছাত্রজীবনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে হলে তাই ছাত্রলীগের অতীত ইতিহাসের প্রতি আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। আমরা দেখেছি যে, ভারত বিভক্তির পূর্বে অর্থাৎ ব্রিটিশ ভারতে মুসলমান জনগোষ্ঠী বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষা দীক্ষায় পশ্চাৎপদ ছিল। আর্থ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তারা ছিল বেশ অবহেলিত। 

এমন একটা পরিস্থিতিতে মুসলমান ছাত্ররা নিজেদের অধিকার দাবি- দাওয়া সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতেই ১৯৩৭ সালে গঠিত হয় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন নামে একটি ছাত্র সংগঠন। ১৯৩৮ সালে 'নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন বিলুপ্ত করে গঠন করা হয় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এই সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলকাতার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে এই সংগঠনটির পক্ষ থেকে শেখ মুজিব অংশগ্রহণ করেন-যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। তা ছাড়া এই সংগঠনের মাধ্যমে শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবসহ অন্যান্যরা ঢাকায় চলে আসেন এবং 'নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এর নামে কাজে শুরু করেন। এসময় অবশ্য পূর্ব বাংলায় ছাত্র ফেডারেশন' নামে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত একটি ছাত্র সংগঠন মোটামুটি সক্রিয় ছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতন ও দমননীতির কারণে এ ছাত্র সংগঠনটি প্রায় ঝিমিয়ে পড়ে। যাই হোক, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান ও শেখ মুজিবুর রহমান। শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ও মুসলিম লীগ সরকারের কট্টর সমর্থক। অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার অনুসারী এবং মুসলিম লীগ সরকারের ঘোর বিরোধী। 

পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও মুসলিম লীগ নেতাদের উপনিবেশিক আচরণ, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রভৃতি উপলব্ধি করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।ফলশ্রুতিতেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে এক কর্মীসভায় গঠিত হয় 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। নবগঠিত এই সংগঠনটিতে শুধুমাত্র কৌশলগত কারণেই 'মুসলিম' শব্দটি ব্যবহার করা হয় পরবর্তীকালে সুযোগ বুঝে শেখ মুজিব মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন নঈমুদ্দীন আহমদ। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের সাংগঠনিক কমিটি ছিল নিম্নরূপ :

১. নঈমুদ্দীন আহমদ, ২. আব্দুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল), ৩. শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর) ৪. অলি আহাদ (কুমিল্লা), ৫. আজিজ আহমদ (নোয়াখালী), ৬. আবদুল মতিন (পাবনা), ৭. দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), ৮. মফিজুর রহমান (রংপুর), ৯. শেখ আব্দুল আজিজ (খুলনা), ১০. নওয়াব আলী (ঢাকা), ১১. নুরুল কবির (ঢাকা), ১২, আব্দুল অজিজ (কুষ্টিয়া) ১৩. সৈয়দ নূরুল আলম ও ১৪. আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করা। এছাড়া সামরিক বাহিনীতে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নিয়োগ, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, পাকিস্তান নৌবাহিনীর সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তর ইত্যাদি। এই সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং নেতা কর্মীরা ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

No comments

-->