শিরোনামঃ

'প্রিয় নীড়'-এ তৃতীয় লিঙ্গের ৫০ জন

'প্রিয় নীড়'-এ তৃতীয় লিঙ্গের ৫০ জন

অনলাইন ডেক্সঃ

অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন ২৬ বছর বয়সী বাহা মনি। সেখানেও ছিল নানা বিড়ম্বনা। তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) মানুষ হওয়ায় কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাইত না। দিলেও সময়-অসময়ে সমাজের (!) চাপে বের করে দেওয়া হতো। মানুষ হিসেবে কোনো মর্যাদা ছিল না। রাস্তাঘাটে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের পাশাপাশি নানা কটুবাক্য ছুড়ে দিত লোকজন। মানুষের কাছে চেয়ে-চিন্তে খাওয়া সমাজের অবহেলিত এক জনগোষ্ঠীর মানুষের এভাবেই দিন কেটেছে। সম্প্রতি তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষের মর্যাদা ফিরেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানে আশ্রয়ও মিলেছে। সরকারের তরফে নেওয়া পুনর্বাসনের নানা পদক্ষেপে এখন বদলে গেছে তাদের জীবনযাত্রা।

বাহা মনির মতো ৫০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এখন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা গ্রামের সরস্বতী নদীর তীর ঘেঁষে সদ্য গড়ে ওঠা হিজড়াপল্লি 'প্রিয় নীড়'-এর স্থায়ী বাসিন্দা। 'মুজিববর্ষে দেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না'- শেখ হাসিনার এমন অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য পাঁচ ইউনিটের সেমি পাকা চারটি ব্যারাকে ৬৬ শতাংশ খাসজমিতে এই আবাসন গড়ে তোলা হয়েছে। তিনজন গুরু মায়ের (হিজড়াদের নেতা) অধীনে থাকা মোট ২০ জন হিজড়ার নামে বরাদ্দকৃত ঘর বানিয়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরে এই ২০ জন তাদের আরও ৩০ জন সখীকে (সতীর্থ) নিয়ে এসেছেন এখানে। সব মিলিয়ে ৫০ জন হিজড়া বসবাস করছেন সাত মাস আগে থেকে। ঘর না পাওয়া ৩০ হিজড়ার জন্যও পর্যায়ক্রমে ঘর তৈরির উদ্যোগ চলছে।

শুধু আশ্রয় নিশ্চিত করা নয়; হিজড়াদের পুনর্বাসনেও সরকারিভাবে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শুরুতে সরকারের পক্ষ থেকে ১০টি গরু দিয়ে গবাদি পশুর খামার প্রতিষ্ঠা ও হিজড়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে নিজেদের অর্থে আরও ১২টি ছাগল এবং হাঁস-মুরগি ও কবুতর কিনে সেগুলোরও খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। সরকার থেকে ১০টি সেলাই মেশিন দিয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে 'প্রিয় নীড়'-এর বাসিন্দাদের। সেই সঙ্গে শাক-সবজির খামার গড়ে তুলেছেন তারা। বাড়ির আঙিনায় গাছপালা ও ফুলগাছও লাগিয়েছেন। গরুর দুধ আর শাক-সবজি বিক্রির পাশাপাশি সেলাই থেকেও আয়ের মাধ্যমে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব হোসেন সমকালকে বলেন, যাদের মা-বাবাসহ পরিবারের লোকজনও সমাজে স্থান দেননি, সেই তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) মানুষদের জন্য মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে নিজস্ব ঘর, জমিসহ স্ব্বাবলম্বী হওয়ার সব ব্যবস্থাই করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুলে 'প্রিয় নীড়' ছাড়াও প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর সদর উপজেলায় হিজড়াপল্লিতে আরও ১২৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার এমন উপহার পেয়ে বর্তমানে নাচ-গান-আনন্দে দিন কাটছে এখন তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষের। মানুষের কাছে যেমন হাত পাততে হয় না, তেমনি স্থানীয়রাও এখন তাদের অনেকটা সমীহের চোখে দেখেন। এখন অনেকটাই মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের আবাসে নিজের মতো বসবাস করছেন তারা। একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন।

এই হিজড়াপল্লির বাসিন্দা তিন গুরু মা আলো, মায়া ও রূপা এবং হিজড়া বাহা মনি, পলি, বরষা, সোনিয়া, পরী মনি, আঁখি, সখীসহ সবার চোখেমুখে এখন খুশির ঝিলিক। অভিন্ন কণ্ঠে তারা যে অনুভূতি তুলে ধরলেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে সেটা এ রকম- হিজড়া হিসেবে জন্ম নেওয়ার পর অতি অল্প বয়সেই বাবা-মা, ভাইবোন ছেড়ে পথে নেমেছিলাম। তারপর এখানে সেখানে দল বেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছি, মানুষের কাছে হাত পেতে পেট চালিয়েছি। থাকার জায়গা ছিল না, সমাজের ভয়ে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায়নি। মানুষ অবহেলা করেছে, কটু কথা শুনিয়েছে। আমাদের মতো অবহেলিত মানুষদের নিয়ে চিন্তা করেছেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই আমাদের জীবনে নতুন আলো ছড়িয়েছেন। ঘর-বাড়ি দিয়েছেন, বেঁচে থাকার অবলম্বন করে দিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে শতকোটি সালাম ও ধন্যবাদ। তার জন্য অন্তর থেকে দোয়া করছি, তিনি যেন অনেক দিন বেঁচে থেকে ও সরকারে থেকে এভাবেই মানুষের সেবা করে যেতে পারেন।

হিজড়াদের কল্যাণে শেখ হাসিনার এমন পদক্ষেপ এবারই প্রথম নয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল ভোটার তালিকা নিবন্ধন ফরমের (ফরম-২) ক্রমিক নম্বর ১৭ সংশোধন করে লিঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'পুরুষ' ও 'মহিলা'র পাশাপাশি 'হিজড়া' অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা হিজড়াদের জন্য এ যাবৎকালের বড় স্বীকৃতি। সরকার হিজড়াদের 'তৃতীয় লিঙ্গ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় একই সঙ্গে তাদের সাংবিধানিক অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্রাংশ হলেও আবহমানকাল থেকে তারা সমাজের অবহেলিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার এ জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নিশ্চিত করে পারিবারিক, আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ; সর্বোপরি তাদের সমাজের মূলধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের সম্পৃক্ত করতে প্রথম এগিয়ে এসেছিল শেখ হাসিনার সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকার গৃহীত 'হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম' এখন অনেকটা এগিয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি- দেশের সব মানুষ যাদের ঘর ও থাকার জায়গা নেই, তাদের জায়গা ও ঘর করে দেবেন। এ লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পের আতওায় প্রথম পর্যায়ে সিরাজগঞ্জ জেলায় ৭৯৬টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও রয়েছেন। সেখানে আরও কেউ আসতে চাইলে তাদেরও পুনর্বাসন করা হবে।

No comments

-->