নতুন প্রকাশিতঃ

১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধান : নামমাত্র ভাষার স্বীকৃতিঃ

১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধান : নামমাত্র ভাষার স্বীকৃতিঃ

নিউজ ডেক্সঃ

১৯৫৬ সালের সংবিধানের ২১৪ অনুচ্ছেদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হলেও এতে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয় যাতে করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিষয়টি শুধুমাত্র কাগুজে বিষয়-এ পরিণত হয়। কারণ, সংবিধানের ২১৪ অনুচ্ছেদে ভাষা সম্পর্কে বলা হয় : 

(১) পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা। তবে শর্ত থাকে যে, সংবিধান দিবসের অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানের যে সকল সরকারী উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ইংরেজী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, সেই সকল উদ্দেশ্যে উক্ত ভাষা সংবিধান-দিবস থেকে আরম্ভ করে ২০ বছর মেয়াদের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকবে এবং উক্ত ২০ বছর অতিবাহিত হবার পর সংসদ আইন দ্বারা যেরূপ উদ্দেশ্য নিরূপণ করবে, সেরূপ উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ইংরেজী ভাষা ব্যবহারের বিধান করা যাবে। 

(২) সংবিধান দিবস থেকে আরম্ভ করে ১০ বছর মেয়াদ অতিবাহিত হলে ইংরেজী ভাষা পরিবর্তনকল্পে সুপারিশ করার জন্য রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন নিয়োগ করবেন।

(৩) অবশ্য ২০ বছর মেয়াদ অতিবাহিত হবার আগেও প্রাদেশিক সরকার প্রদেশে ইংরেজীর পরিবর্তে যে কোন একটি রাষ্ট্রভাষা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নিবৃত্ত হবে না।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদ আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি ছিল দীর্ঘসূত্রিতার মাধ্যমে বাংলার জনগণকে ধোকা দেয়ার নামান্তর। তাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন সূচিত হয়েছিল এবং ১৯৫২ সালের রক্তস্নাত ২১ ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে বাংলার ছাত্র-জনতা যে প্রতিশ্রুতি (বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা) আদায়ে সক্ষম হয়েছিল, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে তা কেবল লিপিবদ্ধই থেকে গেল, প্রয়োগের মুখ দেখলো না। অবশ্য যদিও এই সংবিধানে ২০ বছর মেয়াদ অতিবাহিত হবার পূর্বে ইংরেজী ভাষা পরিবর্তন করে বাংলা বা উর্দুকে প্রাদেশিক ভাষা করার ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারকে দেয়া হয়েছিল, ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করলে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে সেই সুযোগও ভেস্তে যায়।

১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এমনই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে যে ভাষার বিষয়টি প্রায় চাপা পড়ে যায়। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ সামরিক প্রেসিডেন্ট আইউব খান যে সংবিধান চালু করেন। তাতে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে ২১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়: 

(১) পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা ও উর্দু; কিন্তু এই অনুচ্ছেদকে। অন্য কোন ভাষা ব্যবহারের প্রতিবন্ধকরূপে কাজে লাগানো যাবে না; বিশেষত ইংরেজী ভাষা পরিবর্তনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই ভাষা সরকারী ও অন্যান্য উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে।

(২) সরকারী উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য ইংরেজী ভাষা পরিবর্তনের প্রশ্নটি পরীক্ষা ও তার উপর প্রতিবেদন পেশকল্পে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি একটি কমিশন গঠন করবেন।

এভাবে ১৯৫৬ সালের সংবিধানের মত ১৯৬২ সালের সংবিধানেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেয়া হয়। ফলে পরবর্তীতে পাকিস্তানে কোন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় (১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত অস্পষ্ট বিধি বিধান, মৌলিক গণতন্ত্র প্রকৃত অর্থেই তা ছিল 'গণতন্ত্রের পােশাকে মোড়ানো। এক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা প্রভৃতি গ্রহণ করায় শেখ মুজিব এই সংবিধানকে অগণতান্ত্রিক ও অচল বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এসময় ৯ জন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আইউব খানের এই অগণতান্ত্রিক সংবিধানের বিরুদ্ধে একটি যুক্ত বিবৃতি দেন যা বাংলার ইতিহাসে ৯ নেতার বিবৃতি নামে খ্যাত। এই ৯ নেতার মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন একজন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালেও শেখ মুজিব পাকিস্তানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন (১৯৫৫ সালের আগস্ট-সেপ্টম্বর নাগাদ গণপরিষদে বক্তৃতা) এবং ২৯ জানুয়ারি (১৯৫৬) প্রতিরোধ দিবসের ডাক দেন।

এছাড়া গণপরিষদে এই সংবিধান পাস হওয়ার পূর্বেই তিনি তাঁর দলীয় সদস্যদের নিয়ে ওয়াক আউট করেন।

No comments

-->