নতুন প্রকাশিতঃ

বাংলাদেশের চার মূলনীতি : সমাজতন্ত্রের স্বরুপ সন্ধানে।

বাংলাদেশের চার মূলনীতি : সমাজতন্ত্রের স্বরুপ সন্ধানে।

নিউজ ডেক্সঃ

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু্। তরুণ বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকারের পক্ষে আন্দোলন করে ছাত্রত্ব হারিয়েছেন। ইংরেজদের শোষণ থেকে মুক্তির জন্য দেশভাগের সময় পূর্ববর্তী নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তানিরাও বাঙালিকে দাসত্বের শৃঙ্খল পড়িয়ে ফেলেছে। সেসময়কার অনুভূতি সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে স্মৃতি থেকে লিখেছেন, মুসলমানের দেশের মোহ কেটে গেছে। শোষণ আর নিষ্পেষণে সম্প্রদায়িকতা নিগড় থেকে মুক্তি পেতে বাঙালির মমনে তখন জেঁকে বসেছে সমাজতন্ত্র।

আর সময়টাও ছিল তখন বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের বিকাশের। চীন স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৯ সালে আর পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে। অথচ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দ্রুত নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা পরিবর্তন করে চীন। কিন্তু পাকিস্তানিদের শোষণে স্বয়ংসম্পূর্ণ পূর্ব বাংলার মানুষ তখন ক্ষুধা-দারিদ্রে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, ১৯৫৬ সালে শান্তি পরিষদের এক সম্মেলনে চীন দেশ সফরের ঘটনা বঙ্গবন্ধুর মনকে আরো বেশি আলোড়িত করে। এ বিষয়ে 'আমার দেখা নয়া চীন' গ্রন্থে বিস্তারিত লিখেছেন বঙ্গবন্ধু। ওই সফরে প্লেনে ও ট্রেনে করে চীন ভ্রমণের এক পর্যায়ে তিনি চমকে যান। তিনি দেখেন, দেশটি বাংলাদেশের মতোই সুজলা-সুফলা। বাংলাদেশের মতোই তারাও শোষণের শিকার হয়েছে একসময়। ইংরেজ ও জাপানিরা তাদের অনেক কিছুই ধ্বংস করেছে। তবুও তারা স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মধ্যেই কীভাবে নিজেদের বদলে নিচ্ছ! সেখানকার রাষ্ট্রদর্শন, শ্রমিকবান্ধব নীতি, শিল্পকারখানার বিকাশ প্রভৃতি তাকে মুগ্ধ করে।

তখন কমিউনিস্ট সরকার চীনে। তাদের নিয়ে অনেক সমালোচনাও আছে। তবে তাদের উন্নয়নের মহাযজ্ঞ দেখে মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু লেখেন, 'আফিং খাওয়া জাত যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আফিং আর কেউ খায় না। আর ঝিমিয়েও পড়ে না। এদের মনে আশা এসেছে, হতাশা আর নাই। তারা আজ স্বাধীন দেশ হয়েছে, দেশের সব বিছুই আজ জনগণের।'

চীনের শ্রমিকবান্ধব নীতি বঙ্গবন্ধুকে মুগ্ধ করলেও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে চীনের মতো সমাজতন্ত্র কায়েমে বিশ্বাসী ছিলেন না। এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'আমি কমিউনিস্ট নই। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।'

প্রকৃতপক্ষে, এই ভ্রমণ বঙ্গবন্ধুকে অনেক উদ্বেলিত করলেও সমাজকাঠামো বদলে দেওয়ার চিন্তা এখান থেকেই শুরু নয়। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই জনবান্ধব রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর। তারুণ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তিনি। তৎকালীন ভারতবর্ষেও এই দুই বর্ষীয়ান নেতার জনসমর্থন ছিল কৃষকদের মধ্যে। পরে পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতির বিকাশকালে ১১ দফাতেও কৃষক-শ্রমিকদের দাবিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধের তীব্র বিকাশকালেও শোষণহীন সমাজের দাবি ছিল সবখানে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গঠিত ছাত্রলীগসহ অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে পুঁজিবাদবিরোধী উচ্চারণ আসতে থেকে। বিদেশি পূুঁজি বাতিল ও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তফ্রন্টের দাবিতেও যোগ হয় জমিদারি উচ্ছেদ ও পাটকল জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি।

১৯৬৯ সালের ১১ দফাতেও ব্যাংক-বীমা-পাটশিল্প জাতীয়করণের কথা বলা হয়। অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজতন্ত্র কায়েমের কথা বলা হয় ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রচারিত নীতি ও কর্মসূচিতেও।

১৯৭০ সালে নির্বাচনের সময়েও আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে সমাজতন্ত্রের কথা যুক্ত হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জুন মাসে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। 

সেই কাউন্সিল থেকে ঘোষণা করা হয়, 'একচেটিয়া পূুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জমিদারি, জোতদারি, মহাজনি প্রথা বিলোপ সাধন করে; গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তন করে; মানুষের মধ্যে সাম্যনীতি কায়েম করা হবে।' এই ঘোষণার পর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি অভিযান শুরু হয়। এরপর প্রতিটি নির্বাচনি ভাষণেও দেশের সম্পদকে জনগণের মালিকানায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোষণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন এবং সাম্যভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের মূলমন্ত্রকেই বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।

No comments

-->