শিরোনামঃ

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও বাংলাদেশের জন্ম

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও বাংলাদেশের জন্ম।। 



পাকিস্তান সৃষ্টির পর, ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাংলার মানুষের ওপর জাতিগত ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন শুরু হয়।এর প্রতিবাদে, পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ছাত্রদের নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়, সত্তরের দশকে তাতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয় কৃষক-শ্রমিকসহ আপামর জনতা। মুক্ত ভূখণ্ডে, স্বাধীনভাবে, শোষণমুক্ত হয়ে বাঁচার জন্য, বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতির মধ্যে নতুন চেতনার যে অদম্য বহির্প্রকাশ ঘটে- সেটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যার শুরু ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন দিয়ে এবং চূড়ান্ত গন্তব্য অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে।ভাষা আন্দোলনের সূচনা করার মাধ্যমে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অভিন্ন জাতিসত্তার যে বুনিয়াদ রচনা করেন, তা একটি অখণ্ড জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে দেয়।

এই ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণমানুষের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাবধারা জেগে ওঠে। এবং পরবর্তীতে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, দেশভিত্তিক আন্দোলনে রূপ নেয়।যার প্রভাব পড়ে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। পূর্ববঙ্গের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে মাত্র ৯টি আসনে জেতে সমর্থ্য হয় মুসলিম লীগ। বাকি সব আসনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নৌকার প্রতীকের যুক্তফ্রন্ট।১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর, আওয়ামী লীগের তথা পুরো জাতীয় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন বঙ্গবন্ধু। 

১৯৬৬ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাঙালির মুক্তির সনদ বলে খ্যাত 'ছয় দফা'। স্বাধীনতার প্রতি ইঙ্গিত করে, এ প্রসঙ্গে পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, 'দাবি তো মূলত একটাই, কিন্তু একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলি।'

আওয়ামী লীগের সভাপতি হন তিনি এসময়। ছয় দফার প্রচারণায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ঘুরতে থাকেন। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে, তাকে আবারো জেলে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা।কিন্তু জাতীয় মুক্তির যে বীজমন্ত্র তিনি রোপণ করেছিলেন, তা ততদিনে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে গেছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। 

১৯৬৮ সালের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর নামে দায়ের করা হয় 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্যান্য' নামের আরো একটি মামলা। ফুঁসে ওঠে আপামর বাঙালি জনতা। তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনায় ছাত্রদের পাশাপাশি কৃষক-শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেয়।মুজিব ও বাংলাদেশ তখন বাঙালি জাতির কাছে সমার্থক শব্দে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানিরা। এরপর ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসভায় 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাকে। 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে একচেটিয়া জয় পায় আওয়ামী লীগ।স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের জন্য সেদিনই বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ নেতা মেনে গণরায় দেন সাত কোটি বাঙালি।

এসময় থেকে 'জয় বাংলা' স্লোগানটি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে যুদ্ধ শুরু আগ পর্যন্ত, বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি যাবতীয় কার্যক্রম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পালিত হতে থাকে। ঘরে ঘরে উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা।ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাত কোটি মানুষ এককণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে, আর সেই কন্ঠস্বরটি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। 

মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অগাধ দেশপ্রেমের কারণেই তিনি পুরো জাতিকে একসূত্রে আনতে পেরেছিলেন। যে কারণে, দুই হাজার বছরের ইতিহাসে তিনিই শুধু সফলভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটাতে পেরেছেন। যার ফলশ্রুতিতে জন্ম হয় বাংলাদেশের। 

No comments

-->