নতুন প্রকাশিতঃ

অর্থনৈতিক ও নৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা

অর্থনৈতিক ও নৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা

নিউজ ডেক্সঃ

করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব পরিসরে ২০তম অবস্থানে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মান বিচারে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। জনসংখ্যার বিচারে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও আশপাশের অনেক দেশের চেয়ে কম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা প্রতিরোধ এবং খাদ্য উৎপাদনসহ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ব্যাপারে যেমন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তেমনিভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নেও সমভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে করোনাকালে। দুনীতি না থাকলে বাংলাদেশ এ খাতে আরও অগ্রগতি অর্জন করতে পারত। বাংলাদেশে যত কম পারিশ্রমিকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে স্বাস্থ্যকর্মী বা টিকাদান কর্মী পাওয়া যায়, পৃথিবীর খুব কম দেশেই তা পাওয়া যাবে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক কম পারিশ্রমিকে গণশিক্ষা বা ননফরমাল এডুকেশনের জন্য কর্মী পাচ্ছি, পৃথিবীর কয়টি দেশে এমন কর্মী পাওয়া যাবে?

কৃষি খাতে আমাদের সাফল্যও উল্লেখ করার মতো- সনাতনী কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন নতুন কৃষিপণ্যের উৎপাদন যুগান্তকারী সাফল্য এনেছে। কৃষি শ্রমিকদের সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উদাহরণ হিসেবে বিশ্ববাজারে পরিচিত। 

কৃষি খাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর বঙ্গবন্ধুকন্যা খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যা দেশে এবং বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক সাফল্য লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের দূরদর্শী ভূমিকায় দেশের সাত কোটি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। শতকরা নব্বই ভাগ মানুষের হাতে এখন মোবাইল ফোন, প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ পঞ্চম বৃহত্তম মোবাইল মার্কেটের দেশে পরিণত হয়েছে। পাট বাংলাদেশের পুরোনো অর্থকরী ফসল। কিন্তু আধুনিক আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখা বা বৃদ্ধির জন্য পাটের নতুন নতুন ব্যবহার অনেক জরুরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এর উৎকর্ষ এবং বাজার বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছেন। বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। করোনাকালে এক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশেকে।

বঙ্গবন্ধু শূন্য হাতে সদ্য স্বাধীন দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর যেমন মিত্র ছিল তেমনি শত্রুও ছিল। তাদের অনেকেই স্বাধীন দেশকে মেনে নিতে পারেনি। বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। বাঙালি সেদিন বঙ্গবন্ধুর হিমালয়সম নেতৃত্বের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন, আজ তার কন্যা ৬.৫ প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখেছেন। 

করোনার আগে গত বছর তা ছিল ৮.১৫, করোনাকালেও এটি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আরও একটি কথা খুবই গুরুত্ব সহকারে বলে থাকেন, সেটি হলো 'সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ তৈরি করতে হবে, তবেই শহীদদের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ হবে।' অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি আমাদের নৈতিক মূল্যবোধেরও উন্নয়ন হবে- সেটিই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, নৈতিক মূল্যবোধের মারাত্মক অবক্ষয়। আজ থেকে এক হাজার বছর আগের ইতিহাস বা সামাজিক অবস্থার নিরিখে উপমহাদেশের নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টি ইউরোপ বা দূরপ্রাচ্যের সঙ্গে তুলনা করলে এই ভূখণ্ডের মানুষের নৈতিক এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রশংসা করতে হয়। গত কয়েক শতকে ইউরোপ বা দূরপ্রাচ্য অর্থনৈতিক দিক থেকে যেমন অগ্রসর হয়েছে, তেমনি জ্ঞান-বিজ্ঞানেও অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছে। ঠিক তেমনি নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনা বিকাশেও তাদের অগ্রসরতা অনেক। 

পক্ষান্তরে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশ যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে, তেমনি নৈতিক মূল্যবোধের মান বিচারেও পিছিয়ে আছে। পারিবারিক, সামাজিক বা ব্যক্তির মানবিক গুণের বিচারেও আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। আমাদের সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিক মান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অনেকে এর জন্য দ্রুত শহরায়ন ও শিল্পায়নকে দায়ী করছেন। আমাদের চেয়ে ইউরোপ বা জাপানে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ দুটিই বেশি হয়েছে, তাদের নৈতিক মান নিম্নগতির না হয়ে বরং অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় চেতনা লালনের বিষয়টিতেও এই অঞ্চলের মানুষ বেশি যত্নশীল। ধর্ম সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য, নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবতা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্যই চর্চিত হয়। তবে কেন এত মূল্যবোধের অবক্ষয় এই ভূখণ্ডে?

সামাজিক বৈষম্য এই ভূখণ্ডের মানুষকে সম্পদ আহরণে যে কোনো পথ অবলম্বনে প্ররোচিত করে, যেখানে নৈতিক মান বিচারের বিষয়টি একেবারেই গৌন। ইউরোপ বা জাপানে পুঁজির বিকাশের পাশাপাশি ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের জায়গাটিতে সমাজ বা রাষ্ট্রের একটি পরোক্ষ সহযোগিতার বিষয় রয়ে গেছে। সেটি আইন বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা যাই বলা হোক না কেন। এক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা দৃশ্যমান। সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু সমবায়, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও শিল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি কল্যাণকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি উদার জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি সমাজতন্ত্রের বিষয়টিকেও সমভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাধারণভাবে মনে হয়, আর্থিক সচ্ছলতা থাকলে মানুষ অসৎ হবে না, ইউরোপ-আমেরিকায় যা দেখা যায়। কিন্তু পরিচিত দৃশ্য হলো বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে ধনীরাই বেশি অসৎ কাজ করছে, ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে যেমন ঘুষখোর, চোরাকারবারি-মজুদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন; বঙ্গবন্ধুকন্যাও পিতার মতো দুর্নীতিবাজদের হটিয়ে সৎ-দেশপ্রেমিক-ত্যাগী মানুষদের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছেন। কাজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যদি জনকল্যাণে নিবেদিত স্থায়ী কল্যাণকর অবস্থানে নিতে হয়, তবে অর্থনৈতিক ও নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে।

No comments

-->