শিরোনামঃ

ঐতিহাসিক ১১ মার্চ, ১৯৪৮ঃ শেখ মুজিবের কারাবরন

ঐতিহাসিক ১১ মার্চ, ১৯৪৮ঃ শেখ মুজিবের কারাবরন

অনলাইন ডেক্সঃ

১১ মার্চ সকালেই ধর্মঘট সফল করার জন্য ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে অবস্থান গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমুখ সেক্রেটারিয়েটের পাশে পিকেটিং-এর জন্য অবস্থান নেয়। শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক প্রমুখ সেক্রেটারিয়েটের ১ নং গেট (আব্দুল গনি রোড), কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমুখ ২ নং গেটে (তোপখানা রোড) অবস্থান নেন। রমনা পোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান নেন মোহাম্মদ তোয়াহা, সরদার ফজলুল করীম প্রমুখ। সেক্রেটারিয়েটের ১ নং এবং ২ নং উভয় গেটেই পুলিশের সাথে এসব ছাত্র নেতার তুমুল বাকবিতগ্তা হয়। ১ নং গেটে পুলিশ অফিসার শামসুদ্দোহার সাথে শেখ মুজিবের উত্তপ্ত তর্ক বিতর্ক হয় এবং এক পর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের সাথে কথা কাটাকাটির অভিযোগে শেষপর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলীকে গ্রেফতার করে ওয়াইজঘাটের কতোয়ালি থানায় এবং সেখান থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ছাত্রনেতাদের সাথে অনেক কর্মীও কারাবরণ করেন।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এদিন শুধু ছাত্র নেতারাই নয় স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত ছাত্র, সাধারণ জনগণ, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এক নব উদ্যোমে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে এবং প্রচণ্ড বিক্ষোভের মাধ্যমে সরকারের ভিত্তি কাপিয়ে দেয়। উল্লেখ্য যে ১১ মার্চের এই ধর্মঘট শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়। এই দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে কে.জি. মুস্তাফা অত্যন্ত চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। কে.জি. মুস্তাফ ১৯৫২ সালের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মুলতঃ প্রাচীন ও নবীন চিন্তাধারার দ্বন্দ্বের ইতিহাস।...১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর এ দ্বন্দ্ব সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করতে আরম্ভ করে। তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রাচীনপন্থীদের নিকট লাহোর প্রস্তাবের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ নিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র সমবায় (Sovereign and Independent states) গঠনে প্রতিশ্রুতি ভারবর্ষের, বিশেষতঃ বাংলাদেশের তরুণ বুদ্ধিজীবী সমাজকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে। তারা আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেছিল, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা তাদের আত্মবিকাশের দ্বার উন্মুক্ত করবে। বিভিন্ন সংস্কৃতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, গণমুক্তির প্রথম স্তররূপে জাতীয় মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে। তাদের একান্ত প্রত্যয় ছিল, বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সত্তারূপে পাকিস্তান গড়ে তুলতে জাতীয় সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি অপরিহার্য, লাহোর প্রস্তাব তা সুনিশ্চিত করেছে এবং পাকিস্তানকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী করার মূলমন্ত্র ঐ স্বীকৃতিতে নিহিত।

প্রাচীনপন্থীরা নব্যশক্তির মোকাবিলায় ইতিহাসকে বিকৃত করার মহাজনী পন্থা অবলম্বন করলেন-কালক্ষেপন না করে তারা ঘোষণা করলেন এক আল্লাহ, এক কোরান, এক রসূলের অনুসারী মুসলমানদের আবাসভূমি পাকিস্তান হবে এক রাষ্ট্র, একভাষা এক সংস্কৃতির দেশ। লাহোর প্রস্তাবের states শব্দের "S" কে তারা অ্যাখ্যা দিলেন টাইপের ভুল।

লাহোর প্রস্তাবের এই বিকৃত ব্যাখ্যার প্রবক্তারা ভারতের সদ্য বিকাশোখ মুসলিম অর্থনৈতিক স্বার্থের সক্রিয় সহযোগিতায় বলীয়ান। সুতরাং অধিকতর এই বেপরোয়া মনোবৃত্তির নগ্ন প্রকাশ ঘটলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই প্রথমে রেসকোর্স ময়দানে এবং পরে কার্জন হলের সুধী সমাবেশে।...কলকাতা সিটি মুসলিম ছাত্রলীগ “শহীদ-হাসিম' গ্রুপের উদারপন্থী মুসলিম মহল এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ মুসলিম তরুণ বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেন আসন্ন সংগ্রামের সম্মুখীন হওয়ার জন্য। পূর্ব পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক যুবসংস্থা ও একটি প্রগতিশীল ছাত্রসংস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গৃহীত হ'ল। পরবর্তীকালে জন্ম নিল পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ (শামসুল হক ও আতাউর রহমানের নেতৃত্বে) এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটি (শেখ মুজিবুর ও মঈনুদ্দিনের নেতৃত্বে) প্রবীণ চিন্তাধারা ১৫ই আগস্টের পর যেমন পেলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শক্তির উৎসাহ,নবীন চিন্তাধারা পেলো সাংগঠনিক শক্তির হাতিয়ার ও উচ্চতর আদর্শের ধর্ম। ফলে উভয় চিন্তাধারায় স্বাধীনতাপূর্ব কালের সুপ্ত দ্বন্দ্ব স্বাধীনতা উত্তরকালে সুস্পষ্ট সংকটে রূপান্তরিত হল এবং যে সংকটের গভীরতায় যে অভিব্যক্তি ঘটলো কার্জন হলে সেই সূধী সমাবেশ-একমাত্র উর্দুর আসফালন স্তব্ধ হয়ে গেল বজ্রকণ্ঠের না ধ্বনির তরঙ্গাঘাতে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি (৫২) আন্দোলনের পথিকৃত ১১ ই মার্চের (৪৮) আন্দোলন ছিল এই ঐতিহাসিন না’ ধ্বনির উত্তাল তরঙ্গ। ঢেউ লাগলো সারা প্রদেশে। স্বাধীনতাকামী জনসমষ্টির যেন নবযাত্রা শুরু হল। তরুণ সমাজ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। পুলিশের মুখোমুখি। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ। এরা পাকিস্তানের দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তিমিছিলে সামিল হয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধী স্লোগানে কলকাতার রাজপথ কাপিয়ে তুলেছে। ১৯ জুলাইয়ের (১৯৪৬) সর্বাত্মক হরতাল সফল করেছে, 'রশিদ আলী দিবসের যৌথ নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছে। ইতিহাসের গতি নির্ণয় করেছে এরা বালুঘাট উপনির্বাচনে, ৪৫ ও ৪৬ এর সাধারণ নির্বাচনে।

১১ই মার্চ এঁদের ত্যাগের পরীক্ষা, ঈমানের পরীক্ষা, নবলব্ধ চেতনার অগ্নিপরীক্ষাই জয়ী হ'ল। চারদিন সংগ্রামের পর।

No comments

-->