শিরোনামঃ

ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকাল ও ছাত্র মুজিবের ঢাকা আগমনঃ

ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকাল ও ছাত্র মুজিবের ঢাকা আগমনঃ

অনলাইন ডেক্সঃ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা পূর্ব বাংলাকে ইসলামীকরণের অংশ হিসেবে নিত্য ব্যবহার্য খাম, ডাকটিকিট, রেলগাড়ির টিকিট, বিভিন্ন ধরনের ফরম প্রভৃতিতে বাংলা ব্যবহার বন্ধ করে দেয় এবং তার স্থলে ইংরেজী ও উর্দুর ব্যবহার শুরু করে। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ এতে করে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়। অবশ্য পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কিছু ছাত্র-কর্মী ভারত বিভক্তির পূর্বেই সরকারের এহেন ভূমিকা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই মুসলিম লীগের মধ্যে প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি গ্রুপ গঠন করা যায় কি না সেটা তারা ভাবছিলেন। ফলশ্রুতিতে জুলাই মাসে এসব ছাত্রনেতা 'গণ আজাদী লীগ' নামে একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এই ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন কামরুদ্দীন আমহদ, তাজউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ। গণআজাদী লীগের মেনিফেস্টোতে ঘোষণা করা হয় :

রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোন মূল্যই নাই, যদি সেই স্বাধীনতা জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন না করে, কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি ব্যতীত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি অসম্ভব। সুতরাং আমরা স্থির করিয়াছি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে থাকিব।.. বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। এই ভাষাকে দেশের যতোপযোগী করিবার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করিতে হইবে। বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

এসময় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করলে, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদ' পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখে এর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা ছিল যেমন জটিল তেমনি পরস্পর বিরোধীও। অবশ্য এটাও সত্য যে, তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সমর্থন করেননি। এ প্রসঙ্গে একজন লেখক লিখেছেন, "...জুলাইয়ের শেষদিকে দৈনিক আজাদ এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ড. শহীদুল্লাহ...বাংলাকে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রভাষারূপে এবং উর্দুকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের সপক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। আরবী ও ইংরেজীকেও তিনি অনুরূপ মর্যাদা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নের সেই সময় তিনি যুক্তিসিদ্ধ বাস্তব সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলেন একথা বলা কঠিন। তবে এ প্রশ্নে তাঁর অভিমতের গুরুত্ব এখানে যে তিনি একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষার দাবী সমর্থন করেননি।' বদরুদ্দীন উমর সাহেবও অনুরূপ মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর...ভাষা বিষয়ক মন্তব্য এবং সুপারিশ গুলির মধ্যে অনেক জটিলতা এবং পরস্পর বিরোধিতা থাকলেও এগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জটিলতা এবং পরস্পরবিরোধী চিন্তা তার মধ্যেই শুধু ছিল না। সমসাময়িক রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং জনসাধারণের চিন্তার মধ্যেও এ জটিলতা এবং পরস্পর বিরোধিতা যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান ছিল।''

মোটকথা, উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের জোরালো ও যৌক্তিক প্রতিবাদ শুধু ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহই নন পূর্ব বাংলার অনেক শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদও করতে পারেননি বরং অনেকে উল্টো উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছেন। তৎকালীন প্রগতিশীল ও গণতন্ত্রমনা ছাত্ররাই কেবল বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ান এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকায় আগমন করেন এবং ১৫০ মোগলটুলীতে ওঠেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে। এসময় তাজউদ্দিনের সাথে তাঁর যোগাযোগ হয়। তাজউদ্দিন সে সময় গণ আজাদী লীগের কার্যক্রমের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। শেখ মুজিবও এর সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে (১৯৫০) অবশ্য এই সংকলনটি 'সিভিল লিবার্টিস লীগ' নামে আত্মপ্রকাশ করে।

No comments

-->