শিরোনামঃ

একজন নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিক-সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

একজন নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিক-সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম 

অনলাইন ডেক্সঃ ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি মারা যান পরীক্ষিত রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। রাজনীতিতে সততা ও স্বচ্ছতার উদাহরণ রেখে যান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দু'বারের সফল এই সাধারণ সম্পাদক। সততাও যে অধিক শক্তিশালী, সৈয়দ আশরাফের রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে সেই সত্যই প্রতিভাত হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভায় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সততার প্রতীক হিসেবে সৈয়দ আশরাফ তার মন্ত্রণালয়ের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন। 

এমনকি দলীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তাকে ব্যবহার করে কেউ কোনো অনৈতিক সুবিধা নিতে পারেননি। সততার জোরে তিনি সবার হৃদয় জয় করেন। তিনি তার সততার গুণেই মানুষের অনুভূতিতে চির জাগরূক হয়ে আছেন। শুদ্ধ রাজনীতির নতুন পথ উন্মোচন করেছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মৃত্যুর পর তার নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জ-হোসেনপুরের লাখ লাখ মানুষই শুধু নয়, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের জানাজায়ও কয়েক লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো লাখ লাখ মানুষ প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক ও উপমহাদেশের বৃহত্তর ঈদগাহ শোলাকিয়া মাঠে ছুটে আসেন। মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত উপস্থিতি দেখে পূর্বনির্ধারিত কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামের আয়োজন বাতিল করে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠে স্মরকালের সর্ববৃহৎ জানাজার আয়োজন করে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৬৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি এক শিক্ষা সফরে লন্ডন যান। ওই সময় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলাম শহীদ হলে তিনি লন্ডনেই থেকে যান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছাত্ররাজনীতি শেষে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ সালে সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক-এগারোতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল কারাগারে থাকায় তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। সেই সময়ই তার দূরদর্শী ভূমিকার কারণে তিনি আলোচিত হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।পরে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি জনপ্রশাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের পহেলা জানুয়ারি জন্ম নেওয়া সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার দম্ভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সৈয়দ আশরাফ অসুস্থতার কারণে মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি বিজয়ী হন। কিশোরগঞ্জের আধুনিকায়নে তার ভাবনা ছিল দূরদর্শী। এ মাটির ফুসফুস বা প্রাণপ্রবাহ নরসুন্দার নাব্য ফিরে পেতে তারও আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। 

এ জন্য উদ্যোগও তিনি গ্রহণ করেছিলেন। শহরের উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নে একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। তার আগ্রহ ও ভূমিকার কারণে কিশোরগঞ্জে গড়ে উঠেছে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মনে করতেন, জনগণই রাজনৈতিক দলের গণভিত্তি। কোনো বাহিনীর ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক সরকার পরিচালনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

No comments

-->