নতুন প্রকাশিতঃ

রাজশাহীতে সংসার খরচ চালাতে স্বর্ণের অলঙ্কার বেচছেন মানুষ

 রাজশাহীতে সংসার খরচ চালাতে স্বর্ণের অলঙ্কার বেচছেন মানুষ

রাজশাহী প্রতিনিধি:


নগরীর উপশহর এলাকার মোখলেসুর রহমান। তিনি ব্যবসা করতেন। করোনা ভাইরাসের কারণে তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুনভাবে কোনো কাজও জোগাড় করতে পারেননি। তাই বাড়িতে থাকা স্বর্ণ বিক্রি করে তিনি সংসার খরচ চালাচ্ছেন। সেটাও এখন শেষের পথে।


মোখলেসুর রহমান জানান, আমার উপশহরে ছোট একটা খাবার হোটেল ছিলো। লকডাউনের মধ্যে হোটেলটি বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর আর চালু করা সম্ভব হয়না। এমনিতে ধারদেনা ছিলো।হোটেল চালিয়ে সেসব পরিশোধ করছিলাম।লকডাউনের কারণে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর তা সম্ভব হয়নি। পরে বাড়িতে আমার স্ত্রী ও আমার যা গহনা ছিলো সেসব বিক্রি করে সংসার চালাতে হচ্ছে।


শুধু মোখলেসুর রহমান না, তার মতো শতাধিক মানুষ করোনা পরিস্থিতির কারণে সংসার চালাতে নিজেদের সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা শেষ অবলম্বন স্বর্ণের অলঙ্কার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।


এ কারণে ব্যাপক বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও। অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। তার মধ্যে গ্রাহকরা স্বর্ণের তৈরি গহনা কেনার চেয়ে বেশি বিক্রি করতে আসায় আরো বিপাকে পড়েছেন তারা।অনেক ব্যবসায়ী মূলধন না থাকায় কাস্টমারদের কাছ থেকে স্বর্ণ কিনতে পারছেন না।


বুধবার বিকেলে রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজার স্বর্ণপট্টিতে খোঁজ নিয়ে এমন চিত্রই পাওয়া গেলে। এই প্রতিবেদক ২০টি স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলেছেন যার মধ্যে একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী শুধু তার ব্যবসার কিছুটা ভালো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।রাজশাহী সিটিতে ৩০০টি স্বর্ণের দোকান রয়েছে।


স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই চাকুরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।সংসার চালানোর অর্থ না থাকায় অনেকেই শেষ সম্বল স্বর্ণের গহনা নিয়ে এসে বিক্রি করে যাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের কারণে কাস্টমারদের মূলধন না থাকায় শেষ সম্বল স্বর্ণের গহনা বিক্রি করছেন তারা। যাতে করে শেষ সম্বল বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করা যায়।


বৈশাখী জুয়েলার্সের প্রোপাইটার মোহন সরকার জানান, ব্যবসা একদম নেই। তার ওপর যেসব কাস্টমার আগে এসে স্বর্ণের গহনা তৈরি করে নিয়ে যেতেন তারা এখন আসছেন স্বর্ণ বিক্রি করার জন্য। পরিস্থিতি খুব খারাপ।


হাসিনা জুয়েলার্স প্রোপাইটার শহিদুল ইসলামও জানালেন সেই একই কথা। তিনি জানান, কেনার চেয়ে বিক্রি করতেই দোকানে কাস্টমাররা বেশি আসছেন।মূলধন না থাকায় সবার কাছ থেকে স্বর্ণ কেনাও সম্ভব হচ্ছেনা ।ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।


ঝলক জুয়েলার্সের প্রোপাইটার সাইদুর রহমান বলেন, খুব করুণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমার ৪৫ বছরের স্বর্ণ ব্যবসায়ে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হয়নি।অনেক কাস্টমার তার প্রিয় স্বর্ণের তৈরি অলঙ্কার বিক্রি করতে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দেন। বাধ্য হয়ে আমাদেরও কিনতে হয়।


তিনি বলেন, একে স্বর্ণ ব্যবসা খারাপ। তার ওপর ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি বাড়ানোর কারণে আমাদের পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে পড়েছে।


ব্রাদার্স জুয়েলার্স অ্যান্ড ডায়মন্ড ফ্যাশনের প্রোপাইটার মুক্তার মোল্লা বলেন, আজকে (বুধবার) স্বর্ণ বিক্রি করেছি দুই আনা। কাস্টমারদের কাছ থেকে কিনেছি ১০ আনা।


এন হুদা জুয়েলার্সের প্রোপাইটার এন হুদা জানান, ৬০ ভাগ কাস্টমার আসছেন স্বর্ণ বিক্রি করার জন্য। আর ৪০ ভাগ কাস্টমার আসছেন কেনার জন্য।


তবে স্নিগ্ধা জুয়েলার্সের সুব্রত সরকার বলেন, কিছুদিন আগে মানুষ স্বর্ণ বিক্রি করতে বেশি এসেছে। তখন অর্ডার কম ছিলো।তখনকার চেয়ে এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হয়েছে।


বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির রাজশাহী শাখার সভাপতি আসলাম উদ্দিন সরকার বলেন, ১০০ জন কাস্টমারদের মধ্যে ১০ জন কাস্টমার স্বর্ণ কিনছেন। বাকি ৯০ জনই আসছেন স্বর্ণ বিক্রি করতে। তবে করোনা ভাইরাসের পাশাপাশি বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধিও এর কারণ। এছাড়া সিটিতে ৩০০টি দোকানের মধ্যে হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫টি দোকানে কিছুটা বেচাকেনা হচ্ছে। বাকি সবার পরিস্থিতিই খুব খারাপ। তেমন বিক্রি হচ্ছেনা বললেই চলে। অনেকে স্বর্ণের ব্যবসা বন্ধ করে অটোরিকশাও চালাচ্ছে।

No comments

-->